কৃষ্ণ-রাধা প্রেমে বারবার ফিরে আসে রাস লীলা, জানুন অসামান্য এক প্রেম কাহিনির ৮ কথা

এ যেন আধ্যাত্মিকতার আড়ালে এক অসামান্য প্রেম কাহিনি। প্রেমের সর্বোচ্চ উচ্চতায় মনের বন্ধহীন ডোরই যেন এখানে উপজীব্য। ভালবাসা এখানে ‘শারীরিক’ কোনও চাহিদা নয় এক ‘মিলনের তিতিক্ষা’। আর এই মিলন পুরোটাই আধ্যাত্মিক, যাকে আমরা বলি ‘প্ল্যাটোনিক’। এই কারণে আজও কার্তিক পূর্ণিমায় বারবার ফিরে আসে রাস-লীলার অসামান্য প্রেমকাহিনি।দুর্গাপুজোর মতো জাক-জমক না থাকলেও হিন্দুদের অন্যতম এক বড় উৎসব রাস। তবে অঞ্চল বিশেষে রাস-এর প্রভাব এবং জমক কিন্তু বিশাল রকমের। এই রাস নিয়ে কিছু চমকপ্রদ তথ্য—

‘রাস’ শব্দের উৎপত্তি

‘রস’ শব্দ থেকে ‘রাস’-এর উৎপত্তি। মূলত কার্তিক মাসের পূর্ণিমাতে ‘রাস’-এর ক্ষণ। ‘রস’ মানে আনন্দ, দিব্য অনুভূতি, দিব্য প্রেম। হিন্দুশাস্ত্রে কথিত আছে রাস পূর্ণিমাতেই কৃষ্ণলীলা করেন। তাই রাস পূর্ণিমাতেই পালিত হয় রাস-লীলা। এই দিনটি বৃন্দাবনে গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের লীলা করার দিন। ‘লীলা’ মানে নৃত্য। ‘চিরহরণ’-এর গোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃ্ষ্ণের এই লীলা। কথিত আছে গোপীরা নাকি এই দিনটিতে অপেক্ষা করে কৃষ্ণের ডাকের জন্য। কতক্ষণে তাঁদের প্রাণপ্রিয় সখা কৃষ্ণ লীলা-র জন্য ডাক দেবে তা শোনার জন্য নাকি উন্মুখ হয়ে থাকে গোপীরা।

‘রাস-লীলা’-র দুই মত

যদিও, ‘রাস-লীলা’ নিয়ে বেশকিছু মত প্রচলিত আছে। এরমধ্যে বহুল জনপ্রিয় দু’টি মত। এই দুই মতেই কেন এই রাস-লীলা তার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কথিত আছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর শ্রীকৃষ্ণ পাপমোচন ও পূর্ণলাভে গঙ্গাস্নানের স্বপ্নাদেশ পান। এই থেকেই শুরু হয় ‘রাস মেলা’। আবার অন্য মতালম্বীদের মতে, দুর্গাপুজোর পর পূর্ণিমাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে ‘লীলা’-য় মেতেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। আর সেই থেকেই এই পূর্ণিমাতে ‘রাস-লীলা’ পালিত হয়ে আসছে।

‘রাস পূর্ণিমা’-র চাঁদ যেন বিরহকাতর

সখা-র প্রতিভূ দীর্ঘ অসন্দর্শনে সখার মন আজ বিরহকাতর। প্রাণপ্রিয়া-র সঙ্গে মিলনের আকাঙ্খায় তার মন ক্ষত-বিক্ষত। ফিরে আসে যেন বৈষ্ণব পদাবলীর সেই পদ– ‘সই কে বা শোনাইলো শ্যামনাম, কানের মরমে পশিল গো আকুল করিল মোর প্রাণ’। যমুনার জলে শরীর ধুয়ে সন্ধ্যাকাশে ঘরে ফিরেছে গোপীদের দল। কিন্তু, ক্ষণিকের ঘন অন্ধকার কাটিয়ে যেন আকাশ ফুড়ে বেরিয়ে এল সুগোল চন্দ্র। দিব্যকান্ত তার চেহারা। বৃন্দাবন আলোকিত। সোনালী থালার মতো সেই চন্দ্রের আলোয় যে আবেগের বিস্ফোরণ। প্রতীক্ষার তিতিক্ষা মিটিয়ে মিলনের এক বার্তা। চারিদিকে বেজে উঠল কৃষ্ণ বাঁশরী। ঘর ফেলে বৃন্দাবনের পাড়ে ছুটল গোপীরা। হিন্দুশাস্ত্র থেকে ভাষা-সাহিত্য বা বৈষ্ণব পদাবলী সবখানেই কার্তিক মাসের পূর্ণিমার চাঁদের তুলনা টানা হয় দীর্ঘদিন বিদেশ-বিভুইয়ে পড়ে থাকা সখাদের। আর এই মিলনের ক্ষণেই যে লীলা হয়, তারই নাম ‘রাস-লীলা’।

‘রাস-নৃত্য’ কী ‘

রাসলীলা’-য় যে নৃত্য পরিবেশিত হয় তার নাম ‘রাস-নৃত্য’ । এটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত, যথাক্রমে– মহারাস, বসন্তরাস, কুঞ্জরাস, দিব্যরাস, নিত্যরাস। প্রেমরসের এই পঞ্চলীলায় সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ মহারাস-এ। এই পর্যায়েই রয়েছে কৃষ্ণের সঙ্গে রাধা-র অভিসার, গোষ্ঠী অভিসার, গোপীগণের রা-আলাপ, কষ্ণর্তন, রাধানর্তন, গোপীদের নর্তন, শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান-প্রত্যাবর্তন, পুষ্পাঞ্জলি, গৃহগমণ।

বাংলাদেশী মণীপুরী আদিবাসীদের সর্বোৎকৃষ্ট উৎসব

রাসনৃত্য মণীপুরী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্লাসিক্যাল মূর্চ্ছনা। যাকে বলে এক অপূর্ব শৈল্পিক সৃষ্টি। এঁদের রাস-নৃত্যে কৃষ্ণ ও রাধার ভূমিকা দেওয়া হয় পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের। আর গোপীদের ভূমিকায় তরুণীরাই নৃত্য পরিবেশন করেন। বাংলাদেশের মণীপুরী আদিবাসীদের স্থির বিশ্বাস শিশু-দের মধ্যেই থাকে দৈব্যকান্তি। কিন্তু, পাঁচ বছর অতিক্রম করলেই সেই দৈব্যকান্তি রূপ হারিয়ে যায়।

Leave Your Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *